শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

রাজ রাক্ষসদের কবলে কৃষিখাত

॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥

স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী অপশাসন-দুঃশাসনে দেশের কৃষিখাত রীতিমত রাজ রাক্ষসদের কবলে পড়েছে। কৃষিখাত ও কৃষকদের স্বার্থের কথা বলে অনেক ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও আওয়ামী লুটেরা বাহিনী সবকিছু লুটিয়ে নিয়েছে। মূলত, বিগত প্রায় ১৬ বছরের বাকশালী শাসনামলে দেশে সুশাসন বলে কিছুই ছিল না বরং সকল ক্ষেত্রেই লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা রাষ্ট্রের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশে আইন ও সাংবিধানিক শাসন ছিলো পুরোপুরি অনুপস্থিত। ফলে পুরো দেশই অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিলো। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি এবং সবকিছুকেই দলীয়করণ করার কারণে রাষ্ট্র গণমুখী চরিত্র হারাতে বসেছিলো। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনসহ সবকিছুকেই দলীয়করণ করে ফেলা হয়। 

মেধার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে রীতিমত বিপর্যস্ত করে ফেলে। ফলে জনপ্রশাসন জনগণের সেবার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রীতিমত দলবাজিতে লিপ্ত হয়। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট। স্বৈরাচারের আমলের প্রায় ১৬ বছরে দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়। ফলে জাতীয় অর্থনীতি রীতিমত ফোকলা হয়ে পড়ে। মূলত স্বৈরাচারি শাসনামলে পুরো অর্থনৈতিক সেক্টরকেই করা হয় বিপর্যস্ত। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরে রাষ্ট্রাচারে এখন পর্যন্ত স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। জনপ্রশাসনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো এখনো স্বৈরাচারের প্রতিভূদের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে।

মূলত, আওয়ামী শাসনামলে দেশকে রীতিমত পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজার থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট; সোনালী বাংকের হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং ডেসটিনি  কেলেঙ্কারি ছিলো আওয়ামী শাসনামলের বড় বড় কেলেঙ্কারির অন্যতম। সর্বোপরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনাও কারো অজানা নয়। বাকশালী সরকারের আমলে বালিশ ও পর্দাকা-ও দুর্নীতির দুষ্টক্ষত হিসাবে চিহ্নিত। আওয়ামী শাসনামলে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণযোগাযোগ-পরিবহন, কৃষি এবং প্রতিরক্ষাসহ কোন খাতই দুর্নীতিমুক্ত ছিল না বরং আওয়ামী লুটেরা বাহিনী সারাদেশেই লুন্ঠনের মহোৎসব চালিয়ে দেশ থেকে প্রভূত পরিমাণ অর্থ পাচার করে বিদেশের মাটিতে ব্যাপক বিত্ত-বৈভব প্রতিষ্ঠা করেছিলো। কানাডার বেগম পাড়া যার জ¦à¦²à¦¨à§à¦¤ প্রমাণ। দুর্নীতির বরপুত্ররাই কানাডা, সুইজারল্যা-সহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। 

একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আওয়ামী অপশাসন-দুঃশাসনে পুরো দেশই দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়মের জনপদে পরিণত হয়েছিলো। বাদ যায়নি রাষ্ট্রের অন্যতম অর্থনৈতিক খাত কৃষিখাতও। আওয়ামী লীগের নেতাদের উদরপূর্তির জন্য পরিকল্পিতভাবে কৃষি পণ্যের দাম বাড়ানো হলেও কৃষকরা কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়েছেন। এতে লাভবান হয়েছে সরকার সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট। সরকারের কৃষি প্রকল্পগুলোও ছিল দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্য। দেশে  গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি না থাকায় পুরো কৃষি সেক্টরেই নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি  হয়েছিলো। পতিত সরকারের পক্ষে কৃষিকে আধুনিকীকরণ করার কথা বলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এর হিংসভাগই আওয়ামী রাজ রাক্ষসদের ভোগ্য পণ্যে পরিণত  হয়েছে। ফলে কৃষিখাতে রাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থ ব্যয় হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি বরং রাষ্ট্রের এ অতি উল্লেখযোগ্য খাত আজও উপেক্ষিত ও অবহেলিতই রয়ে গেছে। ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি দেশের প্রান্তিক শ্রেণির কৃষকদের। 

সে ধারাবাহিকতায় তদানীন্তন কৃষি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম ও উপর্যুপরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকার ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’। যন্ত্র কেনার জন্য কৃষককে প্রদেয় ভর্তুকির টাকার বড় অংশ হয়েছে লুটপাট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুনে। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদে সে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে এটি আর এগিয়ে নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না বর্তমান কর্মকর্তারা। তাই ব্যয় না করেই প্রকল্পে বরাদ্দ করা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন তাঁরা। তারা পতিত সরকারের সর্বভূক বাহিনীর দায় কোনভাবেই নিতে চান না। ফলে প্রকল্পটি রীতিমত পরিত্যক্ত হতে চলেছে।  

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাণিজ্যিকীকরণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক করে তোলার উদ্দেশ্যে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। এই প্রকল্পে উন্নয়ন সহায়তার (ভর্তুকি) মাধ্যমে কৃষকদের ১২ ধরনের à§«à§§ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র দেওয়ার কথা ছিল। কৃষিযন্ত্র কেনার জন্য হাওড় ও উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের ৭০ শতাংশ এবং অন্যসব এলাকার কৃষকদের ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং সবকিছুই রয়ে গেছে অশুভ বৃত্তেই। ফলে গৃহীত প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। 

মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, বহু প্রকৃত কৃষক এ ভর্তুকির কোন অর্থই পাননি। টাকা জমা দিয়ে যন্ত্রের অপেক্ষায় বসে থাকার নজির যেমন রয়েছে, তেমনি আছে কৃষি পেশার বাইরের লোককে যন্ত্র দেওয়ার ঘটনা। যা পুরো প্রকল্পকেই অকার্যকর করে ফেলেছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সরেজমিন সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রকল্পের মোটা অঙ্কের ভর্তুকির সুবিধায় ভাগ বসিয়েছে তিনটি চক্র। চক্র তিনটি হচ্ছে অসাধু ও ফ্যাসিবাদ ঘনিষ্ঠ কৃষি কর্মকর্তা, যন্ত্র সরবরাহকারী বিভিন্ন কোম্পানি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের দালাল। এসব দালাল মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের সুপারিশে উপজেলা কর্মকর্তারা কৃষকদের নাম সুবিধাভোগীর তালিকাভুক্ত করেন। মূলত, ঘুস হাতবদল হয়েছে তাদের মাধ্যমেই। অনেক সময় দালালেরা নিজেদের নামেই ভর্তুকিতে যন্ত্র কিনে বাইরে অনেক বেশি দামে বিক্রি করে দিয়েছে। এমনকি একই যন্ত্র একাধিকবার বিক্রি করে বারবার ভর্তুকি নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে গৃহীত প্রকল্পে। কৃষিযন্ত্র নষ্ট হলে কোম্পানিগুলো বিক্রয়োত্তর সেবা দেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন অনেক কৃষক। ফলে কৃষকরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বরং বিগত সরকারের দালাল-ফড়িয়ারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।

জানা গেছে, শেষ বছরে এসে দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সহ আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু সিদ্ধান্তটি বিলম্বিত হওয়ায় এ থেকে খুব একটা ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে আসছে কৃষককে ভর্তুকি দেওয়ার নামে অর্থ লোপাটের অনেক তথ্য। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, অনিয়মের অপরাধে বরখাস্ত হতে পারেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৫০ কর্মকর্তা। এমন পরিস্থিতিতে শেষ অর্থবছরে প্রকল্পের তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আগের দায় না নিতে এখন তড়িঘড়ি করে কাজ গোটাতে চাইছেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক। এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো, ‘কয়েক মাস হলো প্রকল্প পরিচালক হয়েছি। কোনো কাজ করতে পারিনি। এ সময়ে ভর্তুকিতে একটি যন্ত্রও সরবরাহ করিনি। আগের অনিয়ম আর দুর্নীতির জবাব দিতে দিতেই ক্লান্ত। শেষ সময়ে প্রকল্পের বাকি কাজ করাও সম্ভব নয়, তাই চলতি অর্থবছরে বরাদ্দের ৪২১ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছি।’ যা কিছুটা ইতিবাচক হলেও দায়সারা গোছের বলতে হবে। কারণ, এর মাধ্যমে সমস্যার কোন সমাধান করা সম্ভব নয়।

প্রকল্পের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুসারে প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৫০৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে প্রায় à§«à§© কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের অর্ধেক পেরোলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাকি ছয় মাসের জন্য কিছু টাকা হাতে রেখে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এতেই সমস্যার সমাধান হবে বলে  মনে করছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দরবেশ কাটা গ্রামের কৃষক আজম নুরের নামে একটি কম্বাইন হারভেস্টার বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। কাগজে-কলমে তাকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ২১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা (৭০ শতাংশ)। কিন্তু আজম নুর টাকা দিয়েও যন্ত্র পাননি। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘ঋণ নিয়ে ৯ লাখ টাকা দিয়েছি। মেশিন দেখিয়ে নিয়ে গেছে। এখনো মেশিন পাইনি, টাকাও ফেরত দেয়নি।’ দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষক মো. মিজানুর রহমান ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে কম্বাইন হারভেস্টার কেনার আবেদন করেছিলেন। কাগজে-কলমে কৃষি অফিস তাকেও যন্ত্র বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু মিজানুর জানিয়েছেন, তিনি কোনো যন্ত্র পাননি।

জানা গেছে, সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত না থাকলেও ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে টি সিডার (পাওয়ার টিলারের সঙ্গে বীজ বপনের যন্ত্র) পেয়েছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার পশ্চিম সোনাদিয়ার বাসিন্দা আমির হোসেন সাজু। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আমির পরে যন্ত্রটি বিক্রি করে দেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় অস্বীকার না করলেও দাবি করেন, তিনি (সাজু) নিজে আবেদন করেছিলেন। যন্ত্র পেয়েছেন বা বিক্রি করে দিয়েছেন কি না, তা তার জানা নেই। এতেই প্রমাণিত হয় বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ডিপিপিতে উল্লেখ করা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অযোগ্য সরবরাহকারীদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভায় মাঠের চাহিদার সঙ্গে এডিপির অর্থ বরাদ্দের সমন্বয় করে উপজেলা পর্যায়ে যন্ত্র বরাদ্দের সংখ্যা চূড়ান্ত করার কথা। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই কমিটির একটি সভাও হয়নি। তখনকার পিডি মো. তারিক মাহামুদুল ইসলাম তার পছন্দমতো যন্ত্র বরাদ্দ দিয়েছেন বলে অভিযোগ। কিন্তু তিনি সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন না করে কম্বাইন হারভেস্টারের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ ভর্তুকির হারে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার জায়গায় প্রায় ২১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা এবং ৫০ শতাংশ ভর্তুকির হারে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার জায়গায় প্রায় ১৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, এটি ডিপিপির আর্থিক শৃঙ্খলার মারাত্মক লঙ্ঘন। অনিয়ম ও দুর্নীতির জেরেই ১২ ক্যাটাগরির ৫১ হাজার ৩০০টি যন্ত্রের বিপরীতে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। অথচ যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৬৫৬টি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দামের যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম- ১০ হাজার ৯৬৩টি। কৃষককে মোট দেওয়ার কথা ছিল ১৫ হাজার ৫০০টি। প্রকল্পের চতুর্থ বছরেই বরাদ্দ করা ভর্তুকির অর্থ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এ জন্য যন্ত্র সরবরাহের সঙ্গে ব্যয়িত অর্থের সংগতি পাচ্ছেন না প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশ করে অযোগ্য কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা এবং ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ ভাগাভাগির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরপরও অভিযোগ ওঠা উপপ্রকল্প পরিচালক আলতাফুন নাহার, ঊর্ধ্বতন হিসাব রক্ষক আব্দুল খালেক সরকার ও সহকারী হিসাব রক্ষক আরমান মিয়ার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ‘অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুদকের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী অন্য অপরাধীদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাকা ফেরতের বিষয়ে কৃষি সচিবের বক্তব্য হলো, ‘প্রজেক্টের মেয়াদ আছে অল্প। কৃষককে ভর্তুকিতে যন্ত্র দেওয়ার বাস্তব চিত্র নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট না। তাই প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়াব না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যেহেতু বড় ধরনের দুর্নীতি চিহ্নিত হয়েছে, তাই অপরাধী কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট না। আইনি প্রক্রিয়ায় জরিমানাসহ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও যন্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানিরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’ 

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, স্বৈরাচারি-ফ্যাসিবাদী আমলে দেশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। রাষ্ট্রের কোন সেক্টরই দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট ও স্বেচ্ছাচারিতার বাইরে নয়। আর সে ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশের কৃষিখাতের ওপর। দেশের কৃষি সেক্টরকে আধুনিকীকরণ ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য পতিত সরকারের আমলে নানাবিধ ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সেসব প্রকল্প মোটেই ফলপ্রসূ হয়নি বরং ফ্যাসিবাদের রাজ রাক্ষসরা সবকিছু গিলে ফেলেছে। 

তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে দুর্নীতি ও অনিয়মকে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে। অন্যথায় দেশে সুশাসন ফেরানো সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ